নিজস্ব প্রতিবেদকঃ তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ লঙ্ঘন করে রাজশাহীর একাধিক সরকারি ও বেসরকারি দপ্তর তথ্য দিতে তোয়াক্কা করছে না—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধান বা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলেই শুরু হচ্ছে টালবাহানা, এড়িয়ে যাওয়া, সময়ক্ষেপণ এমনকি অপমানজনক আচরণ। আর তথ্য অধিকার আইনের আওতায় RTI আবেদন করলেই নানাভাবে আবেদন বাতিল, ঝুলিয়ে রাখা কিংবা চাপ প্রয়োগের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজশাহীতে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন দপ্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতি চললেও তা অনুসন্ধানে সাংবাদিকদের প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। সরাসরি দপ্তরে গেলে কর্মকর্তারা বলেন, “জানি না”, “ওই কর্মকর্তা বলতে পারবেন”, “স্যারের অনুমতি লাগবে”। ফোনে যোগাযোগ করলে “ব্যস্ত”, “মিটিংয়ে আছি” বলে দিনের পর দিন ফোন না ধরার ঘটনাও নিয়মিত।
এই অবস্থায় অভিযোগভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ হলে ‘কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি’ উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে সেই সংবাদকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্থানীয় বা জাতীয় পত্রিকায় প্রতিবাদ জানালেও বাস্তবে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না—এমন অভিযোগও রয়েছে।
অনুসন্ধান গভীর হলে সাংবাদিকরা তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী RTI আবেদন করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে তথ্য প্রদান কর্মকর্তা ও আপিল কর্মকর্তা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবেদন বাতিল বা দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখছেন। আবেদনে সামান্য বানান, শব্দ বা সময়সীমা সংক্রান্ত ত্রুটি দেখিয়ে আবেদন বাতিল করা হচ্ছে, যদিও আইন অনুযায়ী এমন ত্রুটি থাকলে আবেদন গ্রহণের ৫ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে আবেদনকারীকে জানানো বাধ্যতামূলক।
কিছু দপ্তর দাবি করছে, “এই তথ্য আমাদের কাছে নেই”—অথচ সেই তথ্যই আবার অন্য দপ্তরের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার যেসব তথ্য দিলে অনিয়ম প্রকাশ পেতে পারে, সেগুলো ‘মানহানির আশঙ্কা’ দেখিয়ে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আরিফুর রহমান অঙ্কুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তথ্য অধিকার আইনে নির্ধারিত ২০ কর্মদিবস পার হলেও কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। ৪ দিন ফোন না ধরায় বাধ্য হয়ে সরাসরি দপ্তরে যোগাযোগ করলে তিনি নির্দিষ্ট সময় না জানিয়ে “সামনের মাসে যোগাযোগ করতে” বলেন এবং একপর্যায়ে সাংবাদিককে “এখন বিরক্ত করবেন না” , বললাম তো দেখবো বিষয় টা বলে চলে যেতে বলেন।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ক্ষেত্রে লিখিত চিঠি বা ইমেইলের পরিবর্তে ফোন করে জানানো হয়—আবেদনে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক , রাজশাহী হয়ে যাওয়ায় ‘বাংলাদেশ’ শব্দ ব্যবহারের কারণে তথ্য দেওয়া যাবে না, পুনরায় আবেদন করতে হবে। যদিও রাজশাহী উল্লেখ আছে তবু হয়রানির চেষ্টা। এছাড়াও আইন অনুযায়ী লিখিতভাবে জানানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি।
রাজশাহী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দপ্তরে জমা দেওয়া আবেদনের ২২ দিন পর যোগাযোগ করলে ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহন আহমেদ জানান, আবেদনে ১১ মাসের জায়গায় ১২ মাস উল্লেখ করায় আবেদন বাতিল করা হয়েছে। যদিও আবেদন জমার সঠিক তারিখ দপ্তরের নথিতে সংরক্ষিত থাকার কথা। আইন অনুযায়ী ৫ দিনের মধ্যে আবেদন বাতিলের কারণ জানানো হলেও তা করা হয়নি।
আঞ্চলিক রেশম সম্প্রসারন কার্যালয়, রাজশাহী দপ্তরে মোঃ তরিকুল ইসলাম উপ পরিচালক প্রথমে আবেদন গ্রহণ করতেই অনীহা প্রকাশ করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোন করার পর আবেদন নেওয়া হলেও পরবর্তীতে সাংবাদিককে হয়রানির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় প্রভাবশালী ঠিকাদার ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও একই চিত্র । রাজপাড়া দারুস সালাম দাখিল মাদ্রাসায় RTI আবেদন জমা দিতে দীর্ঘ সময় ক্ষেপণ করা হয়। পরে অধ্যক্ষ জানান, সভাপতির অনুমতি ছাড়া তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়—যা তথ্য অধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) ও যুগ্মসচিব মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, এটা গুরুতর অপরাধ। তথ্য অধিকার আইন লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ নেই। আপনি আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে থাকেন। তথ্য কমিশনে অভিযোগ দিলে জরিমানা, আইনগত ব্যবস্থা এবং তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তখন অনিয়ম বা দুর্নীতি প্রমাণিত হলে শাস্তি এমনিতেই হবে। পাশাপাশি কিছু দিনের মধ্যেই রাজশাহীর সব কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি সভা হবে, সেখানে বিভাগীয় কমিশনার স্যারের সামনে এই বিষয়টি আমি সবার সামনে তুলে ধরবো।
তথ্য কমিশন বাংলাদেশের উপপরিচালক হেলাল আহমেদ বলেন,তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী আবেদনকারীকে নিয়ম মেনেই এগোতে হবে। প্রথমে আপিল করবেন। আপিল করার পরও যদি তথ্য না দেওয়া হয়, তাহলে ডাকযোগে মূল আবেদন ও আপিলের প্রমাণ সংযুক্ত করে তথ্য কমিশনে অভিযোগ পাঠাতে হবে। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তারা নিজেরাই আইনের জালে আটকা পড়বে।


















