নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজশাহীর অলিগলি এখন নির্বাচনী পোস্টারে ঢাকা, মাইকের আওয়াজে কান পাতা দায়। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালে হারিয়ে গেছে সেই চিরচেনা নির্বাচনী ‘উৎসব’। আগে নির্বাচন মানেই ছিল পাড়া-মহল্লায় উৎসবের আমেজ, ছোট-বড় সবার ব্যস্ততা আর নাওয়া-খাওয়া ভুলে দলের জন্য কাজ করা। কিন্তু এবারের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে রাজশাহীর সাধারণ কর্মী, পেশাজীবী এবং ভোটারদের মনে বিরাজ করছে এক গভীর হতাশা ও নির্লিপ্ততা।
হারিয়ে গেছে ‘সরকারি চা’ ও শিশুদের সেই চঞ্চলতা
কুমারপাড়ার চা দোকানদার রুবেলের কেটলিতে এখন আর আগের মতো খই ফুটছে না। রুবেল আক্ষেপ করে বলেন, “আগে নির্বাচন মানে ছিল ঈদ। কাপ ধোয়ার সময় পেতাম না, কোনোমতে লিকার দিয়ে চা দিতে পারলেই বাঁচি। একে রাজশাহীর লোকে বলতো ‘সরকারি চা’। নেতারা এসে বলতো—এগুলি আমাদের ছেলেমেয়ে, এরাসহ এলাকার মানুষ যা খাবে খাওয়াবি, সব বিল আমার। তুইও খাবি, মানুষকেও খাওয়াবি; তাদের শুধু বলবি যেন আমার নেতাকে একটু বিবেচনা করে। সেই দিন আর দেখছি না।”

নির্বাচনের মৌসুম হলেও রাজশাহীর চা দোকানে নেই আগের সেই ভিড় ও উচ্ছ্বাস। ছবি- অলকার মোড়
শুধু বড়রা নয়, নির্বাচনের উৎসবে মেতে থাকতো শিশুরাও। আগে ১০-১২ বছরের ছোটরা বড়দের সাথে মিছিলে যেতো। বিনিময়ে চকলেট, বিস্কুট, পুরি বা চপ খেয়েই তারা কী খুশি! এমনকি খেলার সামগ্রীর আবদারও মেটাতেন প্রার্থীরা। এবার সেই চঞ্চলতা আর ছোটদের হাসিমুখ আর চোখে পড়ছে না।
রেকর্ড করা শব্দে হারিয়েছে অসীমের কণ্ঠ
রাজশাহীর অলিগলি এখন কাঁপছে মাইকের আওয়াজে। কিন্তু সেই আওয়াজ কোনো জীবন্ত মানুষের নয়, বরং পেনড্রাইভে ভরা রেকর্ড করা গান। আর এই প্রযুক্তির কাছেই হার মেনেছেন কুমারপাড়ার অসীম কুমার। অসীম জানান, তাঁর সুন্দর বাচনভঙ্গির কারণে আগে নির্বাচনের সময় দলগুলো তাঁকে খুঁজে বের করত। তিনি বলেন, “অটো বা রিকশায় মাইকিংয়ের জন্য আমার ডাক পড়ত। প্রতিদিন ৫০০ টাকা চুক্তিতে প্রচারণা চালাতাম। দোকান থেকে ছুটি নিয়ে এই কাজ করতাম কারণ এতে আনন্দও ছিল, আবার পরিবারের বাড়তি চাহিদাও মিটত। দিনশেষে নেতাদের সাথে আড্ডা দিতাম।” বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি হতাশ হয়ে বলেন, “এখন আর মানুষের দরকার হয় না। একটা গান বা কথা রেকর্ড করে মাইকে বাজিয়ে দিচ্ছে। সারাদিন ওই একই শব্দ বাজছে, ভোটারদের মন জেতানোর সেই চেষ্টাই নেই। এখন আর কেউ আমাকে খুঁজতে আসে না, নিজের কাজ আর সংসার নিয়েই পড়ে আছি।”
নিস্তব্ধ অলকার মোড়ের ‘বাচ্চু ডিজিটাল আর্ট’
নগরীর অলকার মোড়ের ‘বাচ্চু ডিজিটাল আর্ট’-এ আগে নির্বাচনের সময় তিল ধারণের জায়গা থাকত না। এখন সেখানে বিরাজ করছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। দোকানের কারিগর বিপুল, ইমন ও স্বপন তাঁদের ফেলে আসা ব্যস্ত দিনগুলোর কথা মনে করে আক্ষেপ করলেন। তারা জানান, আগে নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা হলেই আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যেত। দুপুর ৩টেয় ঘুম থেকে উঠে শহরের বাইরে কাজ সারতাম, আর সন্ধ্যা হলেই দোকানে ঢুকে পড়তাম। একজন কাঠ কাটত, একজন ফ্রেম বানাতো, আর বাকিরা পিনআপ করে ফেস্টুন রেডি করতাম। সকাল ৮টা পর্যন্ত টানা কাজ চলত। সেই সময় নেতারা খুশি হয়ে আলাদা বখশিস দিত। এখন সেই দিন স্বপ্ন। এবার না পেয়েছি কোনো দোকান থেকে কন্ট্র্যাক্ট, না কোনো নেতা এসে খোঁজ নিয়েছে।

ফাঁকা ব্যানার–ফেস্টুনের দোকান কাজ নেই মেশিন বন্ধ
‘হাইব্রিড’ নেতাদের দাপট ও মাঠের কর্মীদের দূরত্ব
নগরীর এক সাবেক বিএনপি নেতা অভিযোগ করেন, আগে রাজপথে আন্দোলনে থাকলেও এখন ‘নতুন’ নেতাদের দাপটে তারা কোণঠাসা। ৫ আগস্টের পর ঘরে ঘরে নেতা তৈরি হয়েছে। এমনকি এক জামাত নেতাও স্বীকার করলেন, দলের কঠোর নিয়মের কারণে নাম বলতে পারছেন না, কারণ তাতে পদ হারানোর ভয় আছে। তিনি বলেন, আগে পাড়ায় পাড়ায় অস্থায়ী নির্বাচনী ক্যাম্প থাকতো, যেখানে ছোট-বড় সবাই মিলে কাজ ভাগ করে নিত। এবার সেই স্বতঃস্ফূর্ততা নেই।
অনেকের মতে, ১৫ বছর লীগের দালালি করা লোকেরাও এখন বিএনপি-জামাতের ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট নিজের পকেটের টাকা দিয়ে বানিয়ে নিয়ে আসছে কেবল পদ বাগিয়ে নিতে নয়তো দলের সাপোর্ট পেতে। বিএনপির অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের এক পদধারী নেতার দাবি, এবার টাকা খরচের চেয়ে কিছু নেতা টাকা ‘পকেটে ঢোকাতেই’ বেশি ব্যস্ত।
হুমকির মুখে মাঠ সাংবাদিকতা
স্থানীয় এক অনলাইন সাংবাদিক জানান, প্রচারণার ধরনে সাংবাদিকতাও হুমকির মুখে। নেতারা এখন সরাসরি কথা না বলে হোয়াটসঅ্যাপে ‘মিডিয়া সেল’ থেকে নিজেদের মনগড়া লেখা আর ছবি পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, “নেতাদের মনমতো লেখাই যদি হুবহু কপি-পেস্ট করে কিছু অনলাইনে প্রকাশ হয়, তবে মাঠের সাংবাদিকদের দরকার কী?”
উপসংহার
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আর যান্ত্রিক প্রচারণার চাপে রাজশাহীর নির্বাচনী সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মানবিক আবেগ আর সাধারণ মানুষের রুটিরুজির সুযোগ। নেতাদের অনীহা আর কর্মীদের এই নীরবতা আগামী ১২ তারিখের ভোটে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।



















