নিজস্ব প্রতিবেদকঃ আওয়ামী নেতার সুদের খপ্পরে পড়ে এক ব্যবসায়ী ও তার পরিবারের জীবন বরবাদ হওয়ার উপক্রম। মূলতঃ শর্তানুসারে সুদ নিয়ে নিয়মিত টাকা পরিশোধের পরও শর্তভঙ্গ করে ব্যবসায়ীর ঢাকার একটি ফ্ল্যাট বাড়ি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় তাকে দেশের বিভিন্ন জেলায় ১৯টি হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা করেছেন আইনজীবী মোহাম্মদ আলী। সুদের ফাঁদে পড়ে একের পর এক মামলার বোঝা কাঁধে নিতে হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা ও তার পরিবারকে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর নাম আসিফ আলমগীর। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। তবে দীর্ঘদিন ঢাকায় অবস্থান করায়, ঢাকার উত্তরায় মোবাইল এ্যাক্সেসরিজের ব্যবসায় যুক্ত হন তিনি। ২০১৯ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয় আইনজীবী ও আওয়ামী লীগ নেতার মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে। তার বাড়ি রাজশাহীর অক্ট্রোয় মোড়। পরিচয়ের সূত্র ধরে যোগাযোগ ছিলো তাদের মধ্যে।
মোহাম্মদ আলী ভুক্তভোগী আসিফকে জানান, তিনি সুদের ব্যবসা করেন। লাখ প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা সুদ দেওয়ার শর্তে ওই আইনজীবীর কাছ থেকে কয়েক দফায় ২৫ লাখ টাকা নেন আসিফ আলমগীর। এসময় তার স্ত্রী নাফিসা আঞ্জুমান ঐশীর নামে ব্যাংক চেক ও ননজুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে সই নেন। তবে কয়েক দফায় ১৩ লাখ টাকা ফেরত দেন ওই দম্পতি। কিন্তু শর্ত মোতাবেক দুই মাস সুদের টাকা দিতে পারেননি আসিফ। এরপর তাদের ওপর নেমে আসে জুলুম। মোহাম্মদ আলী লাখে ৩৫০০ টাকা সুদ দাবি করেন। এই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনায় ১৯টি মামলা করেন ওই আওয়ামী লীগ নেতা। মামলায় আসিফ আলমগীরের স্ত্রী নাফিসা আঞ্জুমান ঐশি, মা, ভাই তাদের ভাড়াটিয়া এমনকি তাদের আইনজীবীকেও আসামি করা হয়েছে।
আইনজীবী ও আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয়ে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী বাদী হয়ে এসব মামলা করছেন। এখন রাজনৈতিক মামলা দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন ওই কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা। অথচ, খোঁজ নিয়ে জানা যায়- তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ কমিটির সদস্য। তার একটি ভিজিটিং কার্ডে নিজেকে ঢাকার জাতীয় আইন কলেজের প্রভাষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে কার্ডটি যাচাইয়ের পর জানা যায় সেখানে তিনি কর্মরত নন এবং প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরাও তাকে চেনেন না।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলীর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট বাজারে। এলাকায় তার প্রভাবও বেশ। নিজ এলাকায় পরিচয় দেন ব্যারিস্টার হিসেবে। তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সদস্য হওয়ায় ঢাকায় বিভিন্ন বড় বড় আওয়ামী নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় ফ্যাসিস্ট আমলে তিনি অসংখ্য মানুষকে সুদের ফাঁদে ফেলে করেছেন নিঃস্ব স্ববর্স্ব। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মানুষকে করেছেন হয়রানি। এদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির জয়েন সেক্রেটারি বাশিরুল ইসলাম। তিনিও বাদ পড়েননি তার মিথ্যা মামলা থেকে।
ভুক্তভোগীর স্ত্রী নাফিসা আঞ্জুমান ঐশী বলেন, আমার স্বামী ব্যবসার প্রয়োজনে আইনজীবী মোহাম্মদ আলীর কাছে সুদের ওপর ২০২০ সালের ১ নভেম্বর সাড়ে ৩ লাখ টাকা নেন। সেখানে আমার একটি চেক ও স্ট্যাম্প জমা দেই। পরে ২০২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আরও ১ লাখ টাকা নেওয়ার সময় একটি সাড়ে চার লাখ টাকার স্ট্যাম্প সই করে দেওয়া হয়। এজন্য আগের সাড়ে ৩ লাখ টাকার স্ট্যাম্প ও চেক বাতিল করা হবে বলে জানানো হয়। পরে আট দফায় মোট ২৫ লাখ ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী আসিফ জানান, শর্তানুসারে এক লাখ টাকায় প্রতিমাসে ২ হাজার টাকা দিতাম। কিন্তু মোহাম্মদ আলীকে ২ মাস এসব টাকার সুদ দিতে না পারায়, চেক ও স্ট্যাম্প আমার নামে থাকায়; আমার বিরুদ্ধে শুরু হয় অত্যাচার। তখন বাধ্য হয়ে আমার ব্যাংক থেকে মোহাম্মদ আলীর ব্যাংক এ্যাকাউন্টে কয়েক দফায় ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ২০০ টাকা পরিশোধ করা হয়।
টাকা পরিশোধ করলেও তিনি আমাকে চেক বা স্ট্যাম্প ফেরত দেয়নি, বরং আমার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্নভাবে মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন। এখন পর্যন্ত আমি, আমার মা, শাশুড়ি স্বামীসহ বিভিন্ন স্বজনদের ওপর মামলা দিয়েছেন মোহাম্মদ আলী। আমি অ্যাডভোটের কাছে গেলে তার নামেও মামলা দেওয়া হয়। সবগুলো মামলার বাদি তিনি নিজেই। এখন পর্যন্ত আমাদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৯টি মামলা করেছেন। আমাকে রাজনৈতিক মামলা দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ নেতা ও সুদের ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বার কাউন্সিলে অভিযোগ দিয়েও কোনো ব্যবস্থা হয়নি। তার এখন উদ্দেশ্যই হচ্ছে ঢাকার বাড্ডা লিংক রোডের ফ্ল্যাটটি হাতিয়ে নেওয়া।
ভুক্তভোগীর বড়ভাই জাকির হোসেন বলেন, তিনি নিসন্দেহে মামলাবাজ আইনজীবী। মানুষকে মামলা দিয়ে হয়রানি করায় তার কাজ। সে শুধু আমার ছোটভাই আসিফ, তার স্ত্রী, শ্যালক, মা-শাশুড়ি এবং আমার নামেই মামলা করে ক্ষ্যান্ত হয়েছেন এমনটা নয়। তিনি আসিফের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া জাকারিয়া, ভাড়াটিয়ার বাবা, দুলাইভাই ও অফিস স্ট্যাফের নামেও রাজশাহীতে মামলা দায়ের করেছেন। অথচ, তিনি তাদের সঙ্গে এদের কোনো প্রকার পরিচয় বা দেনাপাওনার সম্পর্ক নেই। এভাবে আমাকে এবং আমার ছোটভাই আসিফকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মিথ্যা মামলা দায়ের করে হয়রানি করছে।
ভুক্তভোগীর শ্যালক আদনান বলেন, মামলাবাজ উকিলের মিথ্যা ও হয়রানি মামলায় আমার বোন-দুলাভাই সবাই পথের বসার মতো অবস্থা। এসব মিথ্যা মামলা করে সেগুলো খারিজ হয়ে যাওয়ায় এখন সে রাজনৈতিক মামলায় আমার বোন-দুলাভাইকে ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছে। অথচ, সে নিজেই একজন আওয়ামী লীগার।
এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী বলেন, আমি কখনই আওয়ামী লীগের কোনো কমিটিতে ছিলাম না। তাছাড়া যাদের কাছে থেকে আমি টাকা পায় তারা মিথ্যা বলছে। আমার নামে অপপ্রচার করছে যাতে টাকা না দেওয়া লাগে। ওদের সঙ্গে যা বোঝাপড়া তা আমি আদালতের মাধ্যমে করবো। আপনাকে জবাবদিহি করতে আমি বাধ্য নই, বলেন মোহাম্মদ আলী।#


















