রেলওয়ের ভেতরে ধামাচাপার অভিযোগ, তদন্তেও প্রভাব খাটানোর আভাস
মোঃ সাকিবুল ইসলাম স্বাধীন, রাজশাহী: রাজশাহীতে সহকর্মী নারী কর্মচারীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত রেলওয়ের ফেরো প্রিন্টার খালেক সিকদারের বিরুদ্ধে এখনো কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু রাজশাহী থেকে বদলি করে পাবনার ঈশ্বরদীতে পাঠানো হয়েছে তাকে। অথচ পুলিশ ইতোমধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গড়িমসি ও ধামাচাপার চেষ্টার অভিযোগে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ শুদ্ধতা নিয়ে।
ঘটনাটি ঘটে গেল বছরের ৭ মে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের (সিএমই) দপ্তরে কর্মরত অবস্থায় সহকর্মী নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা চালান খালেক। ভুক্তভোগী নারী জানান, অফিস শেষে সবাই বের হয়ে গেলে তিনি মোবাইল ফোন আনতে ফেরেন। তখন খালেক সিকদার তাকে জাপটে ধরেন। ধস্তাধস্তিতে তিনি আহত হন।
পরদিন বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে যন্ত্র প্রকৌশলী (সদর) ফজলে রব উভয়কে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেখানে খালেক নিজের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চান। তবুও বিভাগীয় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পরে ভুক্তভোগী নারী ২০ জুন চন্দ্রিমা থানায় মামলা করেন। তদন্তে পুলিশ প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে খালেকের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। কিন্তু তারপরও কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্ত না করে শুধু বদলি করে দেয়।
এরপর ৬ জুন রেলওয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রধান করা হয় ডেপুটি সিওপিএস হাসিনা খাতুনকে। তাকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও তিনি গড়িমসি শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত প্রতিবেদনে প্রকৃত ঘটনা উঠে না আসায় ভুক্তভোগী নারী রাজশাহী মহিলা সহায়তা কর্মসূচিতে অভিযোগ করেন।
ওই দপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহবুবা সুলতানা সরেজমিন তদন্ত শেষে ঘটনার সত্যতা পান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “এই ঘটনায় হাসিনা খাতুনকে তদন্তে রাখা উচিত হয়নি। তদন্তে বাহ্যিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা আমি নিজ চোখে দেখেছি।”
তবে অভিযোগ নিয়ে অভিযুক্ত খালেক সিকদার ও তদন্ত কমিটির প্রধান হাসিনা খাতুনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, “খালেকের বিষয়টি আমি জানি। তবে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে—এটি আমার জানা নেই। অভিযোগপত্র দাখিল হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। নারী সংগঠনগুলোর দাবি, রেলওয়ের মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চরম উদ্বেগজনক। তাদের মতে, “এ ঘটনায় অভিযুক্তকে শাস্তির আওতায় না আনা হলে অন্যান্য কর্মক্ষেত্রেও নারী কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন।”
অন্যদিকে রেলকর্মীদের একাংশ মনে করছেন, এ ঘটনায় সঠিক বিচার না হলে রেলওয়ের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে তারা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা জানি, কোনো ব্যবস্থা হবে না—কারণ এ ধরনের ঘটনায় রেলওয়ের উদাসীনতা দেখে দেখে আমরা অভ্যস্ত। নইলে ৫ আগস্টের পরও বহু শ্রমিক লীগ নেতা ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাকর্মী চাকরিতে বহাল থাকতেন না। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তাদের এবং তাদের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী কিংবা পরিবারের সদস্যদের অবৈধভাবে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তারা এখনও বহাল রয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধেই মামলা আছে, তবুও রাজনৈতিক প্রভাবে তারা চাকরি ধরে রেখেছে।
কিন্তু এসব বিষয়ে বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি সমর্থিত কেউ অভিযোগ করলে, কিংবা সাংবাদিকরা অনিয়ম প্রকাশ করলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ শুধু বদলির ব্যবস্থা নেয়। এমনকি সেই বদলিকেও কেন্দ্র করে ৫ আগস্টের পর থেকে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ভেতরে এক ধরনের ‘বদলি বাণিজ্য’ চলছে।”
সবমিলিয়ে, ধর্ষণচেষ্টার মতো গুরুতর ঘটনায় অভিযুক্ত কর্মচারীর বহাল থাকা এবং তদন্তে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রেলওয়ের শুদ্ধতা, ন্যায়বিচার ও নারীর কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।


















